ডুবছে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি

submarin-cabulনিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটসেবা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প হিসেবে দেশে ছয় প্রতিষ্ঠানকে ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল (আইটিসি) লাইসেন্স দেয়া হয় ২০১২ সালের জানুয়ারিতে। বিকল্পব্যবস্থা হিসেবে চালু হলেও তুলনামূলক কম দামে ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করায় মূল সংযোগ হিসেবে এসবপ্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহক আগ্রহ বাড়ছে।

বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে বাজার হারাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)। পাশাপাশি তাদের আয়কমেছে।

জানা গেছে, গ্রাহক পর্যায়ে আইটিসিগুলো প্রতি মেগাবিটস পার সেকেন্ড (এমবিপিএস) ব্যান্ডউইডথ বিক্র করছে গড়ে ২ হাজার টাকার কমে। অন্যদিকে বিএসসিসিএল একই ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করছে সরকার নির্ধারিত ৪ হাজার ৮০০ টাকায়। গত ছয় বছরে দেশে ব্যান্ডউইডথের চাহিদা বেড়েছে ১০ গুণ।

২০০৮ সালে এ চাহিদা ছিল ৭ দশমিক ৫গিগাবিটস পার সেকেন্ড (জিবিপিএস)। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ জিবিপিএসে। এর মধ্যে আইটিসিগুলো সরবরাহ করছে ৫০ জিবিপিএস। আর বিএসসিসিএলের ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার হচ্ছে ৩৫ জিবিপিএস।গত বছরের অক্টোবরেও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির ব্যান্ডউইডথের চাহিদা ছিল ৪২ জিবিপিএস। অর্থাৎ আইটিসিগুলো চালু হওয়ার পর বিএসসিসিএলের ব্যান্ডউইডথের চাহিদা প্রবৃদ্ধি কমছে।

বর্তমানে একমাত্র সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ হিসেবে সাউথ এশিয়া-মিডলইস্ট-ওয়েস্টার্ন ইউরোপ-ফোরের (সি-মি-উই-৪) সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ। এ ক্যাবলের বাংলাদেশ অংশটির ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে বিএসসিসিএল। প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ ক্যাবলের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের প্রায় ১৩টি দেশের ১৫টি ল্যান্ডিং পয়েন্টের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ।

তবে বিভিন্ন সময় সাবমেরিন ক্যাবলের সংযোগ কাটা পড়া বা এটি মেরামতের জন্য বন্ধ রাখা হলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে ইন্টারনেটসেবার গ্রাহকদের। কোনো কারণে সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও বিকল্প ব্যবস্থায় ইন্টারনেটসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে আইটিসির লাইসেন্স দেয়া হয়।

আইটিসি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করছে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি), ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কাছে।

নভোকম লিমিটেড, ওয়ান এশিয়া-এএইচএলজেভি, বিডি লিংক কমিউনিকেশন লিমিটেড, ম্যাংগো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড, সামিট কমিউনিকেশন্স লিমিটেড ও ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেড আইটিসি হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো স্থলভাগ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প সংযোগ ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

ভারতের স্থলভাগ দিয়ে মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের ল্যান্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে এ সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। আইটিসিগুলোর কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটসেবা নিশ্চিত হওয়ায় কল সেন্টার ও বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এতে ব্যান্ডউইডথের ব্যবহার ও চাহিদাও বাড়ছে। তবে বিকল্প ইন্টারনেট ব্যবস্থা হিসেবে আইটিসিসেবা চালুর উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই একে মূল সংযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০১২ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিএসসিসিএলের সর্বশেষ হিসাব বছরের মুনাফা তার আগের বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ২০১৪ সালে ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ সময় প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ৭৫ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা; আগের হিসাব বছরে যা ছিল ১২৪ কোটি ৮৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এতে প্রতিষ্ঠানটির আয়আগের বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। এ প্রসঙ্গে বিএসসিসিএলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সচিব আবদুস সালাম খান বলেন মুনাফার ক্রমহ্রাসমান ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে ব্যান্ডউইডথের দাম আরো কমিয়ে আনতে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে বিএসসিসিএল। এটি অনুমোদন হলে পুরনো গ্রাহকদের আবারো ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন গ্রাহকদের আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।

এছাড়া উদ্বৃত্ত ব্যান্ডউইডথ রফতানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মুনাফার প্রবৃদ্ধি অর্জনে এসব উদ্যোগ সহায়ক হবে। জানা গেছে, বিএসসিসিএলের আয়ের বড় অংশ আসে ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিজড সার্কিট (আইপিএলসি) ভাড়া থেকে।

২০১৪ হিসাব বছরে খাতটি থেকে এসেছে ৬৬ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা; যাআগের বছর ছিল ১২২ কোটি ৪৩ লাখ ৬ হাজার টাকা। এ খাত থেকে বিএসসিসিএলের আয় কমেছে ৪৫ শতাংশ। তবে এ সময় প্রতিষ্ঠানটির আয়ের নতুন দুটি খাত সৃষ্টি হয়েছে।

এগুলো হলো— আইপি ট্রানিজিট সার্ভিস ও কো-লোকেশন চার্জ। আইপি ট্রানজিট সার্ভিস থেকে বিএসসিসিএলের আয় হয়েছে ৭ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অন্যদিকে কো-লোকেশন চার্জ থেকে আয় হয়েছে ১৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এদিকে আয় কমলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যক্ষ পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ২৫ শতাংশ। ২০১৪ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যক্ষ পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২৩ কোটি ৫৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

আগের হিসাব বছরে এর পরিমাণ ছিল ১৮ কোটি ৭৮ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। আইটিসির ব্যান্ডউইডথের ব্যবহার বৃদ্ধিতে বিএসসিসিএলের আয় কমার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফায় বড় সংকোচন হয়েছে। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির নেট মুনাফা হয়েছে ৪৮ কোটি ৮১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা; আগের বছর যা ছিল ১০৯ কোটি ৫৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা কমেছে ৫৫ শতাংশ।

কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৪২ পয়সা; আগের বছর যা ছিল ৫ টাকা ৮২ পয়সা। মুনাফা সংকোচনের ফলে কমেছে ২০১৪ সালের লভ্যাংশ প্রদানের হারও। এ সময় প্রতিষ্ঠানটি ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদানের সমর্থ হয়। আগের বছর ২০ শতাংশ নগদ ও ১৫ শাংশ বোনাস শেয়ারসহ মোট ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেয় বিএসসিসিএল। ২০১২ সালে তালিকাভুক্ত এ কোম্পানির অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত মুনাফার পরিমাণ ১৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের মধ্যে সরকারের হাতে ৭৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৯ দশমিক ৮১, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক ৫৫ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

অন্যতম শীর্ষ আইটিসি প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোমের চিফ স্ট্র্যাটেজিক অফিসার সুমন আহমেদ সাবির বলেন, আইটিসিগুলো প্রতিযোগিতামূলক দামে ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করছে।

বিএসসিসিএলের তুলনায় কমদামে ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করায় এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক বাড়ছে। বিটিআরসির তথ্যানুযায়ী, আগস্ট শেষে দেশে ইন্টারনেটের গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮ লাখ। আগের মাসে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর এ সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার। এ সময় দেশের ছয়সেলফোন অপারেটরের ইন্টারনেটসেবার ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৯৩ লাখ ২৯ হাজার।

আর ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) ও পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্ক (পিএসটিএন) অপারেটরদের ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা ১২ লাখ ৩১ হাজার।

Comments

comments