নতুন যন্ত্রণা ব্যাটারি-চালিত রিক্সা, পঙ্খীরাজ:: সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় বাড়ছেই অবৈধ রিক্সা

batter-ricksawরিক্সা এ শহরের অনেকেরই প্রিয় বাহন। খোলামেলা বলে চড়তে আরাম, খুব দূরে না হলে যে কোন গন্তব্যস্থানে যাওয়া যায়, ভাড়াও অধিকাংশ সময় নাগালে থাকে, পরিবেশ দূষণ হয় না বললেই চলে, হাওয়া খেতে খেতে যাওয়া যায়, রিক্সা ভ্রমন কারো কারো কাছে রোমাঞ্চেরও বিষয় -সব মিলিয়ে রিক্সা চড়তে পছন্দ করেন না এমন লোক খুব একটা পাওয়া যাবে না। তবে রিক্সায় চড়ার উল্টো দিকও আছে……..

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ও শহরতলীতে ব্যাটারী চালিত রিক্সার বেপোরোয়া গতির কারনে অহরহ দূর্ঘটনার শিকার হচেছন পথচারীরা।বুলেটের মতো ক্ষিপ্ত গতির কারনে অনেকেই সময়মত সাবধান হতে পারছেন না। তাই অসহায় অবস্থায় রিক্সার চাপা পরে মারাত্মক ভাবে আহত হচ্ছেন নিরিহ পথচারীরা। পৌর কর্তৃপক্ষের সেদিকে তেমন কোন নজরদারী নেই বলে এই সমস্ত অবৈধ ব্যাটারী চালিত রিক্সা চালকদের দৈরত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ভূক্তবোগীরা জানান।
খবর নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে রিক্সার লাইসেন্স প্রদান বন্ধ না হলেও কেউ এখন রিক্সার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে না। লাইসেন্সধারী রিক্সার সংখ্যা ৪০০ মত। বৈধ রিক্সার বাইরে নগরীতে লাইসেন্সবিহীন রিক্সার দৌরাত্ম্যও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব বৈধ-অবৈধ রিক্সার সাথে যোগ হয়েছে ব্যাটারি চালিত রিক্সা। আর এসব রিক্সা চালাচ্ছেন কিছু মৌসুমী রিক্সা চালকরা। যারা জায়গা না চিনলেও অতিরিক্ত ভাড়া হাঁকাচ্ছেন। রাতদিন রিক্সার দখলেই থাকছে শহরের সড়কগুলোর অধিকাংশ স্থান। দিনভর তীব্র যানজটে নাকাল থাকছে নগরবাসী। এতে নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা। সড়কগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রিক্সা চলাচল করায় রিক্সার নগরীতে পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর।

এ যানের অত্যাচারের উপর মড়ার খড়ার হিসাবে দেখা দিয়েছে ব্যাটারী চালিত যান যা পঙ্খীরাজ হিসাবে পরিচিত। এই পঙ্খীরাজগুলো শুধু যাটজট নয় বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ের জন্যও অনেকাংশে জড়িত।

এসব পঙ্খীরাজের চালকদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ৮০% বা ৮০ ভাগ চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স তো দূরের র্কথা, আইন জানা তো দূরের কথা, রাস্তার সাইনবোর্ডও পড়তে পারে না। প্রতিনিয়ত এলোপাথাড়ি গাড়ী চালানো, এখানে সেখানে যত্রতত্র পার্কিং করে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি করছে। এ সব ব্যাপারে পৌরসভার যানজট নিয়ন্ত্রন নামে একটি দপ্তর থাকলেও তাদের কোন কাজকর্ম বা তৎপরতা কেউই লক্ষ্য করছে না।
হঠাৎ করে অটো রিক্সার জনপ্রিয়তা বাড়লেও ব্যাটারি চার্জে বিদ্যুৎ ব্যাবহারের কোন নিয়ম নীতি না থাকায় এক দিকে যেমন চাপ বাড়ছে বিদ্যুতের, অন্য দিকে নগরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এক একটি অটো-রিক্সায় দুই থেকে সর্বোচ্চো চারটি ব্যাটারি থাকে। যা চার্জ দিতে ১০ ঘন্টা সময় ব্যয় হয়। আর এভাবে অটো রিক্সার ব্যাটারি চার্জে অতিরিক্ত বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। তবে বিদ্যুত ব্যবহারের সুনিদিষ্ট কোন নীতিমালা না থাকায় এসব অবৈধভাবে চার্জ হচ্ছে শহর ও শহরতলীর আশ পাশের গ্রামগুলোর বাসা-বাড়িতে।
একটি ব্যাটারি চালিত রিক্সার ব্যাটারি চার্জে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। প্রতি রিক্সায় চার্জ হিসেবে খরচ হয় ৮০ টাকা। শহরে প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিক্সার খরচ পড়ছে প্রতিদিন ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা। একই ভাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের এক মিটার রিডার জানান, একটি অটোরিক্সায় ৩টি থেকে ৫টি ব্যাটারি থাকে। তিন ফেজের লাইনে চার্জ দেওয়ার সময় লাইনে লোড বেড়ে যায়। তখন ট্রান্সফরমারগুলো ঘনঘন বিকল হয়ে যায়।
অটোর চালকরা যে কোন সময় যেখানে সেখানে ব্রেক করে দাড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাড়ছে যানজটও। এসব রিক্সা কোন লাইসেন্স ছাড়াই চলছে নির্বিঘ্নে। অটো রিক্সা আসার পর যাতায়াতে মানুষের কিছুটা সুবিধা হলেও অতিষ্টও কম নয়।

সম্প্রতি শহরের প্রধান সড়কে পঙ্খীরাজগুলোর চলাচলে জেলা পুলিশ প্রশাসন কিছুটা বিধি-নিষেধ আরোপ করাতে এগুলো এখন গলি পথে ঢুকে প্রচন্ড যানযটের সৃষ্টি করছে।
যেমন- ইতিমধ্যে গোকর্ণঘাট হতে পঙ্খীরাজগুলো কালিবাড়ি হয়ে মঠের গোড়া পর্যন্ত আসত।; ইদানিং পুলিশ কালিবাড়িতেই এগুলোকে আটকে দিচ্ছে। এ পঙ্খীরাজগুলো ওদিক দিয়ে না আসতে পেরে মধ্যপাড়া বাইপাস দিয়ে মৌলভীপাড়া হয়ে মঠের গোড়া পর্যন্ত আসছে। পূর্ব থেকেই মঠের গোড়া থেকে বর্ডার বাজার, পৈরতলা, দায়রাপুরের পঙ্খীরাজ, ব্যাটারি রক্সিাগুলো চলাচল করে আসছে। এর উপর বর্তমানে যোগ হয়েছে গোকর্ণঘাট এবং কালিসীমার গাড়ি। মহল্লার রাস্তায় এতগুলো গাড়ি চলাচল করায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দূর্ঘটনা। মধ্যপাড়া, মৌলভীপাড়া, হালদারপাড়া এলাকায় অসংখ্য স্কুল, কিন্ডার গার্টেন ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার রয়েছে। এসব স্কুলে বা কিন্ডার গার্টেনগুলোতে আসতে গিয়ে শিশুদের বা রোগীদের পড়তে হচ্ছে পঙ্খীরাজদের বিড়ম্বনায়। রাস্তাঘাট বা আইনকানুন সর্ম্পকে ধারনা না থাকাতে এর প্রতিনিয়তই পথচারী, স্কুলগামী বাচ্চাদের গায়ের উপর গাড়ি তুলে দিচ্ছে। এ নিয়ে এমন কোন দিন নেই যে ঝগড়া হয় না।
অতিরিক্ত যন্ত্রনা হিসাবে দেখা দিয়েছে কাজীপাড়া-মৌলভীপাড়া সংযোগ সেতুটি। বেরুবার বা প্রবেশ করার রাস্তা প্রশস্ত না করে ব্রীজটি চালু করে দেয়াতে এখানে প্রতিদিন সকালে তৈরী হচ্ছে অর্বণনীয় যানযট, যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। এ বিষয়ে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় বেশ কয়েকবার লেখালেখি হলেও কর্তৃপক্ষের দুষ্টি গোচর হয়নি। কয়েকদিন আগে, পৌর কর্তৃপক্ষ একটি সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। এই সাইন বোর্ডটিও এখন অদৃশ্য। পৌরসভায় কয়েকবার ধর্না দিয়ে কয়েক দিনের জন্য কমিউনিটি পুলিশের ব্যবস্হা থাকলেও এখন তাও প্রায়ই থাকে না। পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, দৈনিক ভাতা কম হওয়াতে তারা দায়িত্ব পালন করতে চাচ্ছে না।
ট্রাফিক বিভাগের মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌরসভায় পঙ্খীরাজের সংখ্যা ১২০০ থেকে ১৫০০ এর মত এবং ব্যাটারী রিক্সার সংখ্যা ২ থেকে আড়াই হাজারের মত। পৌরসভার বাইরে থেকে এসে যোগ হয় হাজার খানেকের মত পঙ্খীরাজ ও ব্যাটারী রিক্সা।
বর্তমানে পঙ্খীরাজ এবং অটোরিক্সাগুলো মঠের গোড়া, কালিবাড়ির মোড়, রামকানাই স্কুলের সামনে, টেংকের পাড়, বর্ডার বাজার, দঃ পৈরতলা বাস স্ট্যান্ডে, কাউতলী, মেড্ডা, কুমারশীল মোড়, টি.এ রোড়, রেকটোর সামনে, পৌর আধুনিক সুপার মার্কেটের সামনের এলাকাগুলো ঘাট হিসাবে গড়ে তুলেছে। এতে করে এসব এলাকায় তীব্র যানযটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং নাকাল হচ্ছেন পথচারী ও শিশুরা।

অযান্ত্রিক যানগুলোর বিরুদ্ধে লিখিত কোন আইন বা জরিমানার ব্যবস্থা না থাকায় পুলিশ বিভাগ ও অনেকটা অসহায়।

ইতিমধ্যে পঙ্খীরাজ মালিকরা রাজনৈতিক বলয়ে ঢুকে পড়েছে। রাজনৈতিক ব্যানরে চলছে পঙ্খীরাজ মালিক সমিতির লোকজন। এতে করে পঙ্খীরাজ চালকরা হয়ে উঠছে বেপরোয়া।
পঙ্খীরাজ মালিকদের আহ্বায়ক কমিটি তৈরী করে দিয়েছে শ্রমিকলীগ। আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক কান্দিপাড়ার দুলাল, যুগ্ন আহ্বায়ক পল্লব এবং পৈরতলার দুলাল ও জলিল, আফরোজ। এরা বর্তমানে পঙ্খীরাজ গুলোর নিয়ন্ত্রণ করছে।
দেশের বিভিন্ন জেলায় যখন পঙ্খীরাজ ও ব্যাটারী রিক্সা তুলে দেয়া হচ্ছে; কিছু এলাকায় এসব চালক বা চালকরা ও সমিতির লোকজন সর্বোচ্চ আদালত থেকেও প্রত্যাখাত হচ্ছে, সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা সীমিত আকারে মানবিক কারনে কিছু পঙ্খীরাজ ও ব্যাটারী রিক্সার অনুমতি দেবার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভাকে এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা ও মতামত গ্রহন করা অতীব প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষট মহল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে ট্রাফিক বিভাগ। পৌরসভা থেকে এদের নিবন্ধন করার পাশাপশি ট্রাফিক বিভাগের সহযোগিতায় এদের জন্য রাস্তার আইন কানুন সম্পর্কে কর্মশালার ব্যবস্হা করতে হবে।

এ ব্যাপারে একটি পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে । ধরা যাক সব মিলিয়ে আড়াই হাজার অটোর অনুমোদন দেয়া হলো। আড়াই হাজারকে সাত দিয়ে ভাগ করলে প্রতিভাগে পড়ে ৩৬০ টির মতো। সেনাবাহিনীর গাড়ির মত প্রতি ৩৬০টি অটোর মধ্যে সপ্তাহের ৭ দিনের একদিনের নাম উল্লেখ থাকতে হবে। যেমন প্রথম ৩৬০টির মধ্যে লেখা হলো রবি। রবিবার দিন রবি নাম লেখা অটোগুলো রাস্তায় বেরোতে পারবে না। এতে করে শ্রমিকরাও সাপ্তাহিক একদিন বন্ধ পাবে এবং শহরেও প্রতিদিন ৩৬০টি করে অটো না বেরোলে শহরে যানজট কিছুটা হলেও কমবে এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট চালকরা বিশ্রাম পাবে। পাশাপাশি এগুলোর জন্য রোডও ঠিক করে দিতে হবে এবং কোন অবস্হাতেই পৌরসভার বাইরের কোন অটোকে শহরে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না।

Comments

comments