আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমাদের আহ্বানঃ একমাত্র ইসলামি অনুশাসনই পারে রক্ষা করতে নারীর অধিকার

আমরা আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন নিয়ে অনেকে অনেক কথাই বলে থাকি। আসলে সঠিক গবেষণামূলক কথাবার্তা তেমন একটা কাউকে বলতে দেখি না আমরা।

আজকে আমরা এখানে কিছু কথা তুলে ধরার চেষ্টা করবো নারী মুক্তির এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে নিয়ে। জানি না, আমাদের এই লেখায় কেউ মনোক্ষুণ্ন হন কিনা। তবে আমরা মনে করি, আলাদাভাবে একদিনকে ঘিরে নারী দিবস পালন ও নারীর অধিকারের নামে হইচই করার কোনো হেতু নেই।

কারণ, শুধুমাত্র একটি দিবসকে ঘিরে আমাদের যতই মাথা ব্যথা থাকুক না কেনো, এতে কোনো রকম ফল যে আসবে না-আসছে না এর প্রমাণ, চলমান নারী নির্যাতনের অসংখ্য অসংখ্য ভয়াবহ চিত্র। আমরা কি অস্বীকার করতে পারবো, বিগত দিনের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন নারী নির্যাতনের মাত্রা সর্বশীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে।

যদিও আমরা নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণে আগেকার তুলনায় বেশি বেশি লেখালেখি করছি এবং সভা-সেমিনারও হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

কিন্তু আমরা যেমনটি ফলাফল আশা করছি, তেমনটি কি পাচ্ছি? বরং চলমান ধারার নারী আন্দোলনে নারীর অধিকার রক্ষা তো দূরের কথা, যতই দিন যাচ্ছে ততই হ-য-ব-র-ল এক অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ নারী আন্দোলনের যে সুদীর্ঘ ইতিহাস আমাদের পেছনে রয়েছে, এ থেকে আমরা কতটা শিক্ষা লাভ করেছি এবং কতটা বা গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতিহাস স্বাক্ষী, ১৮৪৮ সালে প্রুসিয়ায় সংঘঠিত হয় নারী বিপ্ল­বের প্রথম আন্দোলন।

এরপর ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরে সংগঠিত হয় নারীর ন্যায্য মজুরি, দশ ঘন্টা কাজ, উন্নত কর্ম পরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের এক বিক্ষোভ। এর অনেক পরে ১৯১৪ সাল থেকে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত হয়।

পরে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ৮ মার্চকে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি ১৯৮৫ সালকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ এবং ৮ মার্চকে প্রতি বছর পালনীয় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ ঘোষণা করে। ১৯৯১ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনটিকে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে পালন করার সংস্কৃতি শুরু হয় (!) আমাদের দেশেও তথাকথিত নারী নেত্রীদের পাশাপাশি পুরুষ নারীবাদিরাও শুরু করেন এ আন্দোলন।

বছর ঘুরে এলেই ৮ মার্চকে নির্দিষ্ট করে নারীর অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে তোড়জোরে কার্যক্রম চলে। দেশে-বিদেশে বেশ ঘটা করে ব্যানার-ফেস্টুন, সভা-সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, বাহারি রংচটা পোশাক-পরিচ্ছদে র‌্যালি, দৌড়ঝাঁপ ও বড় বড় বুলিতে প্রকম্পিত করে তোলা হয় মাঠ-ঘাট। আসলে এসব লোক দেখানো কার্যক্রমে আমাদের মায়ের জাত নারীরা কতটা লাভবান হয়, কতটা অধিকার আদায় হয় তাদের?

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তি-পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন থেকে নারীরা কতটুকু রক্ষা পায়? এ প্রশ্নের মাত্রা কিন্তু সাধারণ মানুষের মাঝে দিনে দিনে বেড়েই চলছে। আমাদের দেশে আইন আছে প্রয়োগ নেই। এই কথাটির সঙ্গে দ্বিমত কারো নেই। আমরা দেখে আসছি, দেশে সমাজ সচেতনতার জন্য অনেক কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয়। কিন্তু জনসচেতনতার যেনো কোনো বালাই নেই। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আমাদেরকে একধরনের ব্যাধি আঁকড়ে ধরে রাখছে, শত চেষ্টার পরেও আমরা ছাড়াতে পারছি না এসব ভয়াবহ ভাইরাসকে। পরিবার থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সকল কর্মে নারীরা সমানভাবে নিয়োজিত।

এককথায় পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও নারীর অবদান বিশাল। নারীকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই কোনো ক্ষেত্রেই। তারপরেও নারী আজ সর্বক্ষেত্রেই নিগৃহীত, নির্যাতিত, বঞ্চিত, অবহেলিত। এমন কোনো কাজ নেই যা নারীদের দিয়ে করানো হয় না, করাচ্ছেনা ভোগবাদী মানুষরূপী দানবরা। শুধু তাই নয়, একশ্রেণীর স্বার্থান্ধ পুরুষের পাশাপাশি নারী হয়ে নারীরাও নারীর অধিকার-আন্দোলনের নামে ফায়দা লুটছে দেশ-বিদেশে, অর্থ ও বিত্তের পাহাড় গড়ছে ঘৃণিত পহ্নায়। আর এসব দেখেও যেনো না দেখার ভান করছে দেশকর্ণধাররা।

অথচ, আমাদের সংবিধানের ২৮(১), ২৮/২, ও২৮(৪) উপধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লে­খ রয়েছে, নারী-পুরুষের সমতা, সমাধিকার ও সমমর্যাদার কথা। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সম্পদের মালিকানা, নীতি নির্ধারণ ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, শ্রমশক্তি ও নারীশ্রমের মূল্যায়ণ, নিরাপত্তাহীনতা, নির্যাতন ও সহিংসতাসহ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র বিবেচনায় বাংলাদেশে এখনও নারী-পুরুষের রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য।

কি আপনজন, কি পরেরজন, কি নিজের ঘর, কি নিজের কর্মক্ষেত্র আজ সর্বক্ষেত্রেই নারী দলিত-মথিত, নির্যাতিত ও অহরহ যৌন হয়রানির মত নিকৃষ্টতায় এক অসহনীয় পর্যায়ে জীবনযাপন করছে। ইভটিজিং-যৌন নিগৃহ নিয়ে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ (২) ধারায় বলা হয়েছে,‘কোনও পুরুষ অবৈধভাবে তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কোনও নারীর শ্ল­ীলতাহানী করলে বা অশোভন অঙ্গভঙ্গি করলে তার জন্য এ কাজ হবে যৌন হয়রানী এবং এ জন্য ওই পুরুষকে অনধিক ৩ থেকে ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে এবং এর অতিরিক্ত অর্থ দণ্ডেও দণ্ডিত হতে হবে।’

এরপরেও দফায় দফায় আইন প্রণয়ন হয়েছে নারীদের ঘিরে, নারীর অধিকার সুরক্ষায় আমাদের সংবিধানে রয়েছে বহু ধারা-উপধারা। কিন্তু এসব আইনের কতটা প্রয়োগ হচ্ছে আমাদের দেশে? এই প্রশ্ন কিন্তু এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

শুধু তাই নয়, ১৯৯৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৬ (২) ধারাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এই রায় কি প্রমাণ করে না নারীর অধিকার রক্ষায় সরকার কতটা আন্তরিক? এই আইনে বলা হয়েছে, একইসঙ্গে কোনো নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করলে অপরাধীকে মৃত্যূদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

কিন্তু তারপরেও দেশে এসমস্ত ঘৃণিত অপরাধের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলছে। এখানে মানবাধিকারের ছুঁতোয় হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের এহেন রায় সমাজকে আরো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্ল­াহ প্রদত্ত আইন-কানুন জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ ব্যতীত কোন আন্দোলনই সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছতে পারে না। সর্বাগ্রে ব্যক্তি জীবনে ইসলামের অনুশাসন চর্চায় অভ্যন্ত হতে হবে আমাদের। পর্যায়ক্রমে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী তথা সমাজের সকলের নিকট ইসলামের আহ্বান পৌঁছাতে হবে।

প্রথমে জনে-জনে, ঘরে-ঘরে, বাড়িতে-বাড়িতে, গ্রাম-ইউনিয়ন, থানা-জেলা সর্বোপরি বিভাগকে ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশে ইসলামের অমিয় বাণী পৌঁছানোর চেয়ে বড় কাজ আর কি হতে পারে?। আঠার হাজার মাখলুকাতের স্রষ্টা মহান আল্ল­াহ পাক ইরশাদ করেন, “তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছ আর কিছু অংশ পরিত্যাগ করেছ? তোমাদের মধ্য হতে যারা এরূপ করবে তাদের শাস্তি পার্থিব জীবনে লাঞ্চনা-গঞ্জনা ছাড়া কিছু নয়, আর পরকালে তাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে”।

এককথায়, ইসলামের সত্য ও সুন্দর সঠিক পথ পরিহার করে কেউ মুক্তি পেতে পারে না। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব। তারই একাংশনারী। এই নারী সমাজকে পতিতদশা ও পাশবিকতার হাত থেকে টেনে তুলতে কোরআনি আইনের শিক্ষাগ্রহণ করে মানুষের মত মানুষ হয়ে সত্য ও সুন্দরের পতাকা তলে সমবেত হতে হবে সকল নারী-পুরুষকে।

আর তবেই স্বার্থক হবে আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন। সমাজের সর্বস্তরে নারী পাবে প্রকৃত মুক্তি। আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবো সমাজে।

 

লেখক: মো. আলী আশরাফ খান

আহ্বায়ক, ইভটিজিং, বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রতিরোধ কমিটি

বৃহত্তর দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Comments

comments