একজন সিকান্দার আবু জাফর ও তাঁর কৃতিত্ব: মো. আলী আশরাফ খান

Sikandar-abu-zafar-comillar-khaborপ্রকৃত দেশরত্ন বহু গুণে গুণান্বিত একজন মানুষ ছিলেন সিকান্দার আবু জাফর। কবিত্ব, নাট্যরচনা, গীতিরচনা ও তুখোড় সাংবাদিকতাসহ সম্পাদিকতার মতো অতি গরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তিনি করেছেন সাহসীকতার সঙ্গে। এই উজ্জ্বল প্রতিভাধর সিকান্দার আবু জাফর ১৯১৯ সালে সাতক্ষীরা জেলার তালা থানার তেঁতুলিয়া গ্রাম জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি ছাত্রজীবনের শুরুতেই সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত হয়ে সাহিত্যচর্চায় ব্রত হন এবং ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন। ঐ কলেজে বেশ কিছু সময় পড়াশোনার পর সিকান্দার আবু জাফর কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত কলকাতার ‘দৈনিক নবগুণ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মধ্যদিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে তিনি রেডিও পাকিস্তানে চাকুরি নেন। ১৯৫৩ সালে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এর সহযোগী সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে ‘দৈনিক মিল্লাত¬’ এর প্রধান সম্পাদক হিসাবে গুরু দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত সিকান্দার আবু জাফর এর সম্পাদনায় সাহিত্য মাসিক পত্রিকা ‘সমকাল’ প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা সম্পাদনা-ই সাহিত্যাঙ্গণে তাঁর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বিশেষ করে ঐ সময়ের তরুণ লেখকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও জাতীয়তাবোধ সমুন্নত রাখার পাশাপাশি সৃজনশীল সাহিত্যচর্চাকে বেগবান করার ক্ষেত্রে এই পত্রিকার গুরুত্ব ছিল উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতই।

এই সত্য-নিষ্ঠ ও সাহসী সৈনিক আবু জাফর বিষনজরে পড়েন আইয়ুব খানের শাসনামলে ‘সমকাল-এ’ দেশাত্মবোধক, নির্ভীক ও মুক্ত চিন্তার রচনা প্রকাশের জন্য। ঐ সময় ‘সমকালে’র দু’টি সংখ্যা সরকার বাজেয়াপ্ত করে। তবুও তিনি সরকার কিংবা কোনো অপশক্তির কাছে মাতা নত করেন নি।

বরং তার সৃষ্টিশীল কর্ম চালিয়ে গেছেন মাথা উঁচু করে। তাঁর কর্মধারাবাহিকতার ফলে ১৯৫৮ সালে ‘সমকাল মুদ্রায়ন’ নামে একটি ছাপাখানা ও ‘সমকাল প্রকাশনী’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থাও স্থাপন সম্ভব হয়। এই বিচক্ষণ জ্ঞানের অধিকারী আবু জাফর সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় সমতালে বিচরণ করেছেন। শিশুসাহিত্য, নাটক, উপন্যাস, অনুবাদ, গান ও কাব্য রচনায় তাঁর সৃজনশীল অন্তদৃষ্টি ও আলোক উজ্জ্বলতার পরিচয় পাওয়া যায়।


সিকান্দর আবু জাফরের রচিত উল্লে¬খযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে উপন্যাস: ‘মাটি আর অশ্রু’ (১৯৪২), ‘পুরবী’ (১৯৪৪), ‘নতুন সকাল’ (১৯৪৫), নাটক: ‘শকুন্তলা উপন্যাস’ (১৯৫৮), ‘সিরাজউদ্দৌলা, (১৯৬৫), ‘মহাকবি আলাওল’ (১৯৬৫); কিশোর পাঠ্য: ‘জয়ের পথে, (উপন্যাস, ১৯৪২), ‘নবীকাহিনী’ (জীবনী, ১৯৫১); কাব্য: ‘প্রসন্ন প্রহর’ (১৯৬৫), ‘বৈরী বৃষ্টিতে’ (১৯৬৫), ‘তিমিরান্তিক’ (১৯৬৫), ‘কবিতা-১৩৭২’ (১৯৬৮), ‘বৃশ্চিকলগ্ন, (১৯৭১), অনুবাদঃ ‘রুপাইয়া ওমর খৈয়ামত’ (১৮৬৬), ‘সেন্ট লুইযের সেতু, (১৯৬১), বার্নার্ড মালামুডের ‘যাদুকর কলম’ (১৯৫১), ‘সি!য়ের নাটক’ (১৯৭১), গানঃ ‘মালব কৌশিক’ (১৯৬৯)। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন ভাবধারার ছয়শ’রও অধিক গান রচনা করেন।

কাব্যের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন জীবনবাদী ও স্বাধীনতাকামী। এর মধ্যে তিনি ব্যতিক্রমী রচনা সৃষ্টি করেন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’ ও ‘বাংলা ছাড়ো’ ইত্যাদি তাঁর কবিতা সর্বস্তরের জনগণকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিভীষিকাময় মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্র ‘অভিযান’ সম্পাদনা করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর আবু জাফর ‘মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইন সাহায্য কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। নাট্যসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী পুরষ্কার লাভ করেন তিনি ১৯৬৬ সালে। এককথায় এই বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন এ বাংলার গৌরব-আমাদেও অহংকার। যা আমাদের সৃষ্টিশীল কর্মের অনুপ্রেরণারই বিরাট উৎস। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট দেশের এই বিশাল কৃতিত্বের অধিকারী আমাদের প্রকৃত দেশরত্ন পৃথিবী ছেড়ে চিরতরে চলে যান পরপারে।

 

Comments

comments